প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
ফুলবাড়ীতে ভাঙা সাঁকোয় আট গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ, নদী পারাপারে ভরসা এখন সাঁতার
অনীল চন্দ্র রায়, কুড়িগ্রাম ||
কেউ বুকসমান পানিতে হেঁটে পার হচ্ছেন, কেউ সাঁতরে পৌঁছাচ্ছেন নদীর ওপারে। আবার কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছেন। এভাবেই প্রতিদিন নদী পারাপার করতে হচ্ছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার আট গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে।বারোমাসিয়া (বাণিদাহ) নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ বাঁশের সাঁকোটির অর্ধেকের বেশি অংশ দুই থেকে তিন মাস আগে ভেঙে গেছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দারা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ।বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী এলাকায় নবিউলের ঘাট নামে পরিচিত স্থানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাঁকোটির দক্ষিণ পাশের মাঝামাঝি প্রায় ১৫০ ফুট অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে আছে। ফলে সাঁকোটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে কেউ পানিতে নেমে, কেউ সাঁতরে আবার কেউ ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা অংশ অতিক্রম করছেন।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় চার দশক ধরে এ নদী পারাপারে ছোট ডিঙি ও মাঝারি নৌকা ছিল দুই পাড়ের মানুষের একমাত্র ভরসা। করিমের ঘাট ও নবিউলের ঘাট দিয়ে ইজারাদারের মাধ্যমে নৌকায় পারাপার হতেন তাঁরা। পরবর্তী সময়ে নদীর প্রশস্ততা কমে এলে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। এরপর প্রায় দেড় যুগ ধরে সাঁকোটি ব্যবহার করে আসছেন আশপাশের গ্রামের মানুষ।প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের আগে স্থানীয়ভাবে সাঁকোটি মেরামত করা হলেও এবার দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বাঁশের পাটাতন ও কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কয়েকটি স্থানে বড় অংশ ভেঙে যায়। এরপর থেকেই দুর্ভোগে পড়েছেন নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দারা।এ সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী, চরগোরকমন্ডল, ঝাউকুটি, পশ্চিম ফুলমতি, নাওডাঙ্গা ও শিমুলবাড়ী এলাকার হকবাজারসহ লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরখারুয়া ও খারুয়া গ্রামের মানুষ।নদী পারাপারের সময় মাথায় বাদামের বোঝা নিয়ে বুকসমান পানি মাড়াচ্ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মিনতি রানী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘খালি ছবি তোলেন বাহে। দুই-তিন মাস ধরে এত কষ্ট করে নদী পারাপার হচ্ছি, কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেননি। ছেলেমেয়েদেরও অনেক কষ্ট করে নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। আমরা আর এ দুর্ভোগ সহ্য করতে পারছি না। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত করা হোক।’স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী আকাশ মাহমুদ ও কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, এ পথ দিয়ে প্রতিদিন এলাকার হাজারো মানুষ নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট বাজারে যাতায়াত করেন। পাশাপাশি দেড় থেকে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বালারহাট আদর্শ স্কুল, বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ফুলবাড়ী কলেজে পড়াশোনা করে। সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার না হলে তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে।বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, শাকিব ও সবুজ মিয়া এবং কলেজশিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার ও মঈনুদ্দিন জানায়, সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় তাদের যাতায়াতে চরম সমস্যা হচ্ছে। বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় কখনো সাঁতরে, আবার কখনো ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা সাঁকো পার হতে হয়। পারাপারের সময় অনেকেই পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। দ্রুত সাঁকোটি মেরামতের দাবি জানায় তারা।নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় মৎস্য খামারি আতাউর রহমান রতন বলেন, বারোমাসিয়া নদীর ওপর নির্মিত সাঁকোটি দুই পাড়ের হাজারো মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। এটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। কেউ বুকসমান পানিতে নেমে, কেউ ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন। জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সাঁকোটি মেরামত অথবা টেকসইভাবে নতুন সাঁকো নির্মাণ করা প্রয়োজন।নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী জানান, ভেঙে যাওয়া সাঁকোটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। সাঁকোটি নির্মাণ করা হলে দুই পাড়ের হাজারো মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে। জনস্বার্থে দ্রুত এটি পুনর্নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ হাসান বলেন, সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে একটি টেকসই বাঁশের সাঁকো নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাইয়ুম তালুকদার
উপদেষ্টা সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা