প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
দেশজুড়ে যায় ফলতিতার মাছ, প্রতিদিন বেচাকেনা কোটি টাকার
মুর্শিদুল ইসলাম ইমন খান , বাগেরহাট ||
ভোরের
আলো ফোটার আগেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার ফলতিতা মাছের বাজার। বাগেরহাট, খুলনাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মৎস্যঘের থেকে মাছ আসে এ বাজারে। দেশের
বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে মাছ কিনে নিয়ে যান নিজ নিজ এলাকায়। চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের একটি অংশ রপ্তানি হয় বিদেশেও।দক্ষিণাঞ্চলের
অন্যতম বৃহৎ এ পাইকারি মাছের
বাজারে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে তা বেড়ে তিন
থেকে চার কোটি টাকায় পৌঁছায়। মাছের বেচাকেনাকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছেন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট বহু মানুষ।
তবে মাছের খাবার ও পোনার দাম
বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম পাওয়া
এবং বাজারের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।সরেজমিনে
দেখা যায়, ভোর ৬টা থেকেই পিকআপ, নসিমন, ভ্যান ও ট্রাকে করে
বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ আসতে শুরু করে। সকাল ৮টার মধ্যে পুরোদমে জমে ওঠে বাজার। আড়তের সামনে সারি সারি মাছের প্যাকেট সাজিয়ে রাখেন শ্রমিকেরা। পাইকাররা মাছের আকার ও মান দেখে
দরদাম করে কিনে নেন। এরপর শ্রমিকেরা মাছ প্যাকেটজাত করে গাড়িতে তুলে দেন। বেচাকেনা চলে বেলা ১টা পর্যন্ত। বিকেলের আগেই বাজারের ব্যস্ততা কমে আসে।বাজারে
রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাবদা ও পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন
প্রজাতির সাদা মাছের পাশাপাশি বাগদা, গলদা ও ভেনামি চিংড়ি
বিক্রি হয়। এসব মাছের বড় অংশ আসে
বিভিন্ন মৎস্যঘের থেকে। দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এখান থেকে মাছ কিনে নিজ নিজ এলাকার বাজারে সরবরাহ করেন।মাছ
বিক্রি করতে আসা রুবেল বলেন, ফলতিতায় মাছ আনলে বসে থাকতে হয় না। দ্রুত
বিক্রি করে নগদ টাকা নিয়ে চলে যেতে পারি। বাজারের পরিবেশও ভালো, আড়তগুলো গোছানো। তবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার সঙ্গে মাছের খাবারের দামও অনেক বেড়েছে। ফলে লাভ কমে গেছে কোনো কোনো সময় লোকসানও হচ্ছে।রামপাল
থেকে মাছ বিক্রি করতে আসা মৎস চাষী সৌরভ বলেন ,নিজের ঘেরের মাছ নিয়ে আসলাম বর্তমানে মাছের দাম কিছুটা কম। তবে অন্য হাটের তুলনায় এখানে ভালো দাম পাওয়া যায়। দ্রুত মাছ বিক্রি করে বাড়ি ফেরা যায়।মাছ
ব্যবসায়ী টিটু বলেন, এখানে বাগদা, গলদা, রুই, কাতলা, মৃগেল ও গ্লাস কার্পসহ
বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এ বাজার থেকে
দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ সরবরাহ করা হয়। তবে আগের তুলনায় বর্তমানে মাছের বাজার কিছুটা খারাপ।দীর্ঘদিনের
ব্যবসায়ী মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫
বছর ধরে তিনি এ বাজারে ব্যবসা
করছেন। তাঁর মতে, ফলতিতা পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত একটি
মাছের মোকাম। এখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায় এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা মাছ কিনতে আসেন। ফলতিতা
বাজারের বৃষ্টি ফিশের পাটনার মোঃ মিজান বলেন, তাঁদের আড়তে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০
লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। রামপাল, নড়াইলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ আসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এখানে মাছ কিনতে আসেন।তিনি
বলেন, আমাদের আড়তে বাগদা, গলদা, কাতলাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ বিক্রি হয়। চাষিরা মাছ নিয়ে এলে তাঁদের সঙ্গে সঠিকভাবে লেনদেনের চেষ্টা করি। মাছের ওজন ও দাম নিয়ে
যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে
বিষয়ে আমরা সতর্ক থাকি। আড়তগুলোতে সিসি ক্যামেরা থাকায় নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রয়েছে।একই
আড়তের শ্রমিক ছামাদ বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে
তিনি এখানে কাজ করছেন। পাইকারদের কেনা মাছ প্যাকেটজাত করা, সাজানো ও গাড়িতে তুলে
দেওয়ার কাজ করেন তিনি। কাজের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয় তাঁর।মাছ
কিনতে আসা আকরাম বলেন, এখানে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির
মাছ পাওয়া যায়। তেলাপিয়া ও পাবদাসহ বিভিন্ন
মাছ তুলনামূলক কম দামে মাছ
পাওয়া যায় বলে বাজারটি পাইকারদের জন্য সুবিধাজনক।পাবদা, পাঙ্গাস ও রুইসহ বিভিন্ন
মাছ কিনে নিজ এলাকায় বিক্রি করি। এতে লাভের সুযোগও রয়েছে।বৃষ্টি
ফিশের আড়তের ম্যানেজার খিরোদ পোদ্দার বলেন, দীর্ঘ ২২ বছরের বেশি
সময় ধরে এ ফলতিতা মাছের
ব্যবসা করছি। প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০
লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এখানে মাছ কিনতে আসেন।চাষিরা সরাসরি ঘের থেকে মাছ নিয়ে এসে আমাদের আড়তে বিক্রি করেন। মাছের মান ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে
আমরা সচেতন থাকার চেষ্টা করি। তবে মাছের খাবার ও পোনার দাম
যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় চাষিরা
অনেক সময় মাছের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। এতে অনেকে লাভ করতে পারছেন না, কেউ কেউ ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়ছেন।তিনি
আরও বলেন, বাইরের কিছু ব্যবসায়ীর কাছে বাকিতে মাছ বিক্রির টাকা সময়মতো না পাওয়ায় আড়তদারদেরও
ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বাজারের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু লেনদেন
বজায় রাখার পাশাপাশি চাষিদের উৎপাদন খরচের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।তিনি
বলেন, ফলতিতা বাজারে প্রতিদিন দুই থেকে তিন কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দেশের
বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এখানে মাছ কিনতে আসেন। চিংড়িসহ কিছু মাছ বিদেশেও যায়। বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের বড় অংশই ঘেরে
উৎপাদিত।বাগেরহাট
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজকুমার বিশ্বাস বলেন, ফকিরহাট উপজেলার ফলতিতা মাছের আড়ত এ অঞ্চলের অন্যতম
বৃহৎ মৎস্য বাজার। এখানে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫
মেট্রিক টন মাছ বিক্রি
হয়। বছরে মোট বেচাকেনার পরিমাণ প্রায় ১৪ থেকে ১৫
হাজার মেট্রিক টন।তিনি
বলেন, প্রতিদিন এ বাজার থেকে
প্রায় ২০ থেকে ২৫
মেট্রিক টন মাছ দেশের
বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সারা বছরে এখানে প্রায় সাত থেকে আট হাজার মেট্রিক
টন চিংড়ি বিক্রি হয়। বাজারটিতে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। মৌসুমের সর্বোচ্চ সময়ে তা বেড়ে তিন
থেকে চার কোটি টাকায় পৌঁছায়।তিনি
আরও বলেন, এখানে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও উন্নত ড্রেনেজ
ব্যবস্থারও প্রয়োজন। এসব অবকাঠামোগত সুবিধা উন্নত করা গেলে বাজারের পরিবেশ আরও ভালো হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের
মৎস্য অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ফলতিতা মাছের বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হলেও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাছের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন সংশ্লিষ্টদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাইয়ুম তালুকদার
উপদেষ্টা সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা