প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাঘকে হারিয়েছিলেন, এখন দারিদ্র্যের কাছে হারার শঙ্কা টাইগার সামাদের
মুর্শিদুল ইসলাম ইমন খান , বাগেরহাট ||
সুন্দরবনের
গহীনে হিংস্র বাঘের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা জীবন-মরণ লড়াই করে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন আব্দুস সামাদ হাওলাদার। তবে সেই লড়াইয়ে হারিয়েছেন দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি। একসময় সাহসিকতার সেই গল্পে পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘বাঘা সামাদ’
বা ‘টাইগার সামাদ’
নামে। অথচ ৩৫ বছর পর
সেই মানুষটির জীবন কাটছে দারিদ্র্য, দৃষ্টিহীনতা আর অনিশ্চয়তায়।আব্দুস
সামাদ হাওলাদার বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে প্রায় ৩৫ বছর আগে
আরও তিনজনের সঙ্গে সুন্দরবনে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তিনি।সেদিন
কাজের ফাঁকে সুন্দরবনের নদীর তীরে একটি গোলপাতা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে নাস্তা করছিলেন সামাদ। হঠাৎ পেছন থেকে একটি বিশাল বাঘ এসে তার ওপর হামলে পড়ে।বাঘটি
প্রথমে তার ঘাড়ে থাবা বসিয়ে আক্রমণ শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে সামাদও হাল ছাড়েননি। বাঘের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে জিহ্বা ধরার চেষ্টা করেন। পরে দুই কান শক্ত করে ধরে বাঘটির পিঠে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে ঝাঁকিয়ে ফেলে দেয় বাঘটি।একপর্যায়ে
বাঘটি তার গলা ও কপালে কামড়
বসাতে থাকে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয় গভীর ক্ষত।
তবুও জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান সামাদ।সামাদের
ভাষ্য, একপর্যায়ে শেষ শক্তি দিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে বাঘটির নিচের ঠোঁটে কামড় বসান তিনি। এতে তার নিচের তিনটি দাঁত বাঘের ঠোঁটে গেঁথে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাঘটি তার চোখের ওপর আঘাত করে জঙ্গলের ভেতরে চলে যায়।প্রায়
এক ঘণ্টার সেই ভয়াবহ লড়াইয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান সামাদ।বাঘটি
চলে যাওয়ার পরও জ্ঞান হারাননি তিনি। হাত দিয়ে চারপাশে বাঘটিকে খুঁজতে থাকেন। পরে সঙ্গে থাকা তিনজন তাকে উদ্ধার করেন। শরীরের ক্ষতস্থান গাছের পাতা দিয়ে বেঁধে নৌকায় করে সুন্দরবন থেকে প্রথমে মোংলায় নেওয়া হয়। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাকে খুলনার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।প্রায়
এক মাস ১৮ দিন হাসপাতালে
চিকিৎসাধীন থাকলেও আর ফিরে পাননি
চোখের আলো।বাঘের মুখ থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসার পর এলাকায় সাহসিকতার
প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সামাদ। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তার সেই লড়াইয়ের গল্প। পরিচিতি পান ‘বাঘা সামাদ’
ও ‘টাইগার সামাদ’
নামে।কিন্তু
সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিতি ও আলোচনাও হারিয়ে
গেছে। দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে এখন স্ত্রী আলেয়া বেগমকে সঙ্গে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।স্বামীকে
পথ দেখানো থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজ—সবকিছুতেই পাশে থাকতে হয় আলেয়া বেগমকে।
কখনো মানুষের সহযোগিতা, আবার কখনো বাড়ির সামনে ছোট্ট দোকান—এভাবেই চলে তাদের সংসার।সামাদের
দুই ছেলে ও এক মেয়ে
রয়েছে। অভাবের কারণে তার দুই ছেলে আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকেন এবং দিনমজুরের কাজ করেন। নিজেদের সংসার চালাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়।বাঘা
সামাদ বলেন,যখন হাত ও চোখে ব্যথা
শুরু হয়, তখন টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারি না। খুব কষ্টে দিন কাটে। এখন কেউ যদি সহযোগিতা করেন, তাহলে অন্তত চিকিৎসা ও সংসারের খরচে
কিছুটা স্বস্তি পাব।স্থানীয়
বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন,সামাদ ভাই বাঘের সঙ্গে লড়াই করে জীবন বাঁচিয়েছেন। সেই সময় তাকে সবাই সাহসী মানুষ হিসেবে চিনত। কিন্তু এখন তিনি দুই চোখে দেখতে পারেন না। সংসার চালাতেও কষ্ট হয়। তার মতো একজন মানুষের পাশে সমাজ ও সরকারের সহযোগিতা
থাকা দরকার।আরেক
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন,বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ের ঘটনাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে বেঁচে ফিরেছিলেন। আজ তার বয়স
হয়েছে, চোখেও দেখতে পান না। পরিবারটি খুব কষ্টে আছে। সামাদের জন্য সরকারি সহায়তা ও একটি স্থায়ী
আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।৩৫
বছর আগে সুন্দরবনের গহীনে বাঘের সঙ্গে জীবন-মরণ লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিলেন আব্দুস সামাদ হাওলাদার। সেই লড়াইয়ে হারিয়েছিলেন দুই চোখের আলো।এখন
তার লড়াই দারিদ্র্যের সঙ্গে, অন্ধকারের সঙ্গে আর প্রতিদিন একটু
ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য।
বাঘের
থাবা থেকে জীবন ফিরে পাওয়া সেই ‘টাইগার সামাদ’
আজও যেন জীবনযুদ্ধের এক সাহসী যোদ্ধা।
কিন্তু জীবনের এই শেষ লড়াইয়ে
তার প্রয়োজন একটু সহায়তা, একটু নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাইয়ুম তালুকদার
উপদেষ্টা সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা