প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
তিন মাসের অবরোধের সুফল মিলছে সুন্দরবনে
মুর্শিদুল ইসলাম ইমন খান , বাগেরহাট ||
তিন
মাসের অবরোধে বদলে গেছে সুন্দরবনের চেনা দৃশ্যপট। মানুষের আনাগোনা ও বনজ সম্পদ
আহরণ বন্ধ থাকায় প্রাণ-প্রকৃতিতে ফিরেছে সজীবতা। নির্ভয়ে বনের পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাঘ, হরিণ, কুমির, বানর, বন্য শূকর ও লাল কাঁকড়াসহ
নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। মানুষের হস্তক্ষেপ কমায় খাল ও নদীগুলোতেও বেড়েছে
মাছের উপস্থিতি। একই সঙ্গে ঘন হয়ে উঠছে
সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন
প্রজাতির উদ্ভিদ। দীর্ঘদিনের এই বিরতিতে যেন
প্রকৃতি নিজস্ব ছন্দে ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে সুন্দরবন।বনজ
সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং বন্য ও জলজ প্রাণীর
প্রজনন সুরক্ষায় তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ ও সব ধরনের
বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন পর্যটক, জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা। এরই
মধ্যে তিন মাসের অবরোধের সুফল দৃশ্যমান হয়েছে বলে দাবি করছে বন বিভাগ।অবরোধ
চলাকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক দেখা
মিলেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। কখনো খালের পাড়ে, আবার কখনো বনের ভেতরে বাঘের উপস্থিতি নজরে এসেছে। পর্যটকদের মন কেড়েছে কুমিরের
শিকার ধরার দৃশ্য। বনের নানা প্রান্তে হরিণের পাল, বানর, লাল কাঁকড়া ও বন্য শূকরের
অবাধ বিচরণও দেখা যাচ্ছে।বন
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন মাস মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীরা পেয়েছে নির্ভয়ে চলাচলের সুযোগ। একই সময়ে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননও হয়েছে নির্বিঘ্নে। ফলে বনের খালগুলোতে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।তবে
অবরোধ চলাকালে বন অপরাধের আশঙ্কা
থাকায় বন বিভাগকে জোরদার
করতে হয়েছে টহল। জোয়ার-ভাটার সময় হিসাব করে ২৪ ঘণ্টাই সুন্দরবনে
পাহারা দিয়েছেন বনকর্মীরা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে স্মার্ট পেট্রোলিং।পূর্ব
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল
ইসলাম বলেন, অবরোধ বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বন
অপরাধ কমেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণও বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে।বন
বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিং করা হলেও তিন মাসের অবরোধ চলাকালে তা বাড়িয়ে ২০
দিন করা হয়। এতে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে
রাখার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়
ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছে বন বিভাগ।এদিকে
অবরোধ শেষ হওয়ায় সুন্দরবনে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছেন উপকূলের জেলেরা। নৌকা ও জাল মেরামত,
প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহসহ সব প্রস্তুতি প্রায়
শেষ। দীর্ঘ তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার খাল ও নদীতে পর্যাপ্ত
মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা।মৌয়াল
জীবন কর্মকার বলেন, তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের
মতো মৌয়ালদের অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়েছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার বড় ভরসা। নিষেধাজ্ঞা
শেষে আবার বনে যেতে পারব, মধু সংগ্রহ করতে পারব—এতে আমরা খুবই আশাবাদী। তবে বন ভালো থাকলেই
আমরা ভালো থাকব। তাই নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহ করব এবং বনের কোনো ক্ষতি হয় এমন কাজ
করব না।শরণখোলার
জেলে আলাল শেখ বলেন, তিন মাস বনে যেতে পারিনি। নৌকা-জাল মেরামত করে রেখেছি। এতদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার বনে গেলে ভালো মাছ পাব—এমন আশা করছি। মাছ ভালো পাওয়া গেলে আমাদের মতো বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা কমবে।শুধু
জেলে নয়, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মৌয়ালরাও অপেক্ষায় রয়েছেন বনে ফেরার। শরণখোলার মৌয়াল জীবন কর্মকার বলেন, “তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের
মতো বনজীবী মানুষের সংসারে টানাপোড়েন গেছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার প্রধান ভরসা। নিষেধাজ্ঞার কারণে বনে যেতে না পারলেও আমরা
চাই সুন্দরবন ভালো থাকুক। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে, তাই আবার বনে গিয়ে মধু ও অন্যান্য বনজ
সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা চালাতে পারব এটাই আশা। তবে বন থেকে সম্পদ
নিতে গিয়ে যেন বনের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও
আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।বন
বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ
আহরণ বন্ধ রাখা জরুরি। এতে বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন
হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজননও নিশ্চিত হয়।পূর্ব
সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয়
বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন
নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় টহলও বাড়ানো হয়। এবারও অবরোধের সুফল হিসেবে বনে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও খালে মাছের
উপস্থিতি বেড়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম
অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।সুন্দরবনের
পূর্ব ও পশ্চিম বন
বিভাগে রয়েছে ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর এসব পর্যটনকেন্দ্রে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি বন বিভাগের কাছ
থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে বছরের
বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধলাখ বনজীবী সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ
করেন।সুন্দরবনের
বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন
সুরক্ষায় ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর
করে আসছে বন বিভাগ। এবারের
তিন মাসের অবরোধ শেষে বনের প্রাণ-প্রকৃতিতে যে সজীবতা ফিরেছে,
তা ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাইয়ুম তালুকদার
উপদেষ্টা সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা