প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
কোটি টাকার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলে নেই শিক্ষার্থী, জঙ্গল-ঝোপে ‘ভুতের বাড়ি’ ভবন
মুর্শিদুল ইসলাম ইমন খান , বাগেরহাট ||
দৃষ্টি
প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের জন্য
নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক একটি দুইতলা ভবন। উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী
শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্মাণের পর বছরের পর
বছর পেরিয়ে গেলেও নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়নি। নেই কোনো শিক্ষার্থী, নেই নিয়মিত শিক্ষকও। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা ভবনটি এখন ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম ও আগাছায় ঢেকে
গেছে। দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা, বিভিন্ন স্থানে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ভেতরে পড়ে থাকা সরকারি সরঞ্জামও নষ্ট হওয়ার পথে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পরিত্যক্ত কোনো
‘ভুতের বাড়ি’।বাগেরহাট
সদর উপজেলার ১নং কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ব্যাংকের মোড়েরর শরৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন ‘সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম’-এর বর্তমান চিত্র
এটি।স্থানীয়
সূত্রে জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের
উদ্যোগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের উদ্দেশ্যে
শরৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন জমিতে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। ২০১২-১৩ সালের দিকে
ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়।স্থানীয়দের দাবি, ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা
বা তারও বেশি। তবে প্রকল্পের অনুমোদিত বাজেট, নির্মাণকাজ শুরুর ও শেষের সুনির্দিষ্ট
সময় এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের তারিখ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।সরেজমিনে
গিয়ে দেখা যায়, দুইতলা ভবনটির চারপাশ বড় বড় গাছ,
লতাগুল্ম ও ঝোপঝাড়ে ছেয়ে
গেছে। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব ও শ্যাওলা জমেছে।
বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে জানালা-দরজাও। ভবনের ভেতরে পড়ে আছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও মালামাল। দীর্ঘদিন
ব্যবহার না হওয়ায় এসব
সরঞ্জামও নষ্ট হওয়ার পথে।ভবনটিতে
নিয়মিত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতিও দেখা যায়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাসরিন বেগম নামে একজন ঝাড়ুদার মাঝে মধ্যে এসে ভবনটি ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে চলে যান। এছাড়া নিয়মিত
কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সেখানে
দেখা যায় না। ফলে দুইতলা ভবনটি দিনের পর দিন অযত্নে
পড়ে থাকায় চারপাশে জঙ্গল-ঝোপ তৈরি হয়েছে।শুধু
ভবনই নয়, প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণের কারণে শরৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য ও খেলার জায়গাও
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ভবন ও আশপাশের স্থাপনা
নির্মাণের কারণে শিশুদের খেলাধুলার জায়গা অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাওয়ায় পুরো এলাকাটি পরিত্যক্ত বাড়ির মতো দেখায়।কাড়াপাড়া
ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য হায়াত উদ্দিন বলেন, স্কুলটি প্রতিবন্ধী শিশুদের থাকা ও পড়ালেখার জন্য
করা হয়েছিল। শুরুতে কয়েকদিন কার্যক্রম চলত। পাহারার জন্য একজন লোকও রাখা হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে আর কাউকে আসতে
দেখিনি। এখন পুরো ভবনটি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। সরকারের এত বড় সম্পদ
এভাবে নষ্ট হতে দেখে আমাদের কষ্ট লাগে। দ্রুত এটি চালু করা দরকার।স্থানীয়
বাসিন্দা মোহন বলেন, আমি যতদিন ধরে এখানে আছি, তেমনভাবে কোনো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে এই স্কুলে পড়াশোনা
করতে দেখিনি। মাঝে মধ্যে কর্মকর্তারা আসেন, কিছুক্ষণ থাকেন, আবার চলে যান। এখন গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে পুরো
জায়গাটি পরিত্যক্ত বাড়ির মতো হয়ে গেছে।শরৎচন্দ্র
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র সুমিত বলেন, আমরা এই বিদ্যালয় থেকে
পড়াশোনা করে বের হয়েছি। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলটিতে কখনো নিয়মিত শিক্ষার্থী বা লোকজনকে আসতে
দেখিনি। এখন ভবনটি ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে। ভেতরে থাকা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নষ্ট হচ্ছে।স্থানীয়দের
অভিযোগ, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সন্ধ্যার পর ভবন ও
আশপাশের এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনাও দেখা যায়। এতে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও
উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।প্রতিষ্ঠানটি
স্থাপনের পেছনে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও
তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।শরৎচন্দ্র
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহকারী লাচ্চু শেখ বলেন, ১৯৮১ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অফিসের
কর্মকর্তারা বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। পরে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যক্রম শুরু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
একপর্যায়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম চললেও তাদের মধ্যে একজন ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতকার্য হতে পারেনি।তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যালয়ের কাছ থেকে জমি নেওয়া হয়। ২০১২ সালের পর সেখানে প্রায়
এক কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নির্মাণের পর থেকেই ভবনটি
কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝে কিছুদিন সমাজসেবা ও মৎস্য বিভাগের
কর্মকর্তারা সেখানে থাকলেও বর্তমানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম নেই। ভবনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মালামালও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।শরৎচন্দ্র
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আসাদুল কবির বলেন, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য শরৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জমি সমাজকল্যাণ ও সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের
নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ভাগ্নি মুস্তারি খাতুন প্রতিবন্ধী সংস্থায় চাকরি করতেন। তাঁর অনুরোধেই বিদ্যালয়ের জমি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।তিনি
আরও বলেন, ভবন নির্মাণে এক কোটি টাকারও
বেশি বাজেট ছিল বলে আমি জানি। নির্মাণকাজের সময় শ্রমিকদের থাকার জন্য বিদ্যালয়ের জায়গাও ব্যবহার করা হয়েছিল। ভবন নির্মাণের কারণে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও খেলার জায়গাও
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।দৃষ্টি
প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এম নাজমুল
সাকিব বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ওই স্কুলে কোনো
শিক্ষার্থী নেই। স্কুলটি চালু হওয়ার পর থেকে আমি
একজন শিক্ষার্থীও পাইনি। বিশেষ করে বাগেরহাট সদর থেকে স্কুলটি দূরে হওয়া এবং রাস্তাঘাটের সমস্যার কারণে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সমস্যা হয়। আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েও শিক্ষার্থী খুঁজেছি। কিন্তু পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, নাইটগার্ডসহ যেসব বরাদ্দ থাকার কথা, বর্তমানে সেগুলো নেই। গত তিন বছর
ধরে নিয়মিত যে বরাদ্দ দেওয়া
হতো, সেটিও বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থী না থাকায় বাজেটও
বন্ধ। আমরা স্কুলটি আবার চালু করার চেষ্টা করছি।ভবনটি
নির্মাণে কত টাকা ব্যয়
হয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত বাজেট কত ছিল, কখন
নির্মাণকাজ শুরু ও শেষ হয়েছে
এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কবে হয়েছে- এসব বিষয়ে জানতে বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।বাগেরহাট
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সন্তোষ কুমার নাথের কাছে জানতে চাইলে তাঁর
কাছে এ বিষয়ের কোনো তথ্য নেই বলে জানান।স্থানীয়দের
প্রশ্ন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের জন্য
নির্মিত এত বড় একটি
সরকারি স্থাপনা যদি ব্যবহারই না হয়, তাহলে
কোটি টাকার এই বিনিয়োগের সুফল
কোথায়? বছরের পর বছর ভবনটি
অব্যবহৃত পড়ে থাকলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা ও ভেতরে থাকা
সরঞ্জাম- দুটিই নষ্ট হয়ে যাবে।স্থানীয়
বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিটি ভবনের প্রকল্প ব্যয়, অর্থবছর, নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সাধারণ মানুষের জানার জন্য দৃশ্যমান থাকা উচিত। কিন্তু এই ভবনের সামনে
প্রকল্পের ব্যয়, নির্মাণকাল বা অর্থবছর উল্লেখ
করে কোনো বিলবোর্ড বা তথ্যফলকও দেখা
যায়নি।
তাদের
দাবি, দ্রুত ভবনটি সংস্কার করে প্রয়োজনীয় জনবল ও বরাদ্দ নিশ্চিত
করতে হবে। পাশাপাশি বাগেরহাট সদরসহ আশপাশের এলাকায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের শনাক্ত করে তাদের জন্য শিক্ষা ও আবাসনের ব্যবস্থা
চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণের প্রকল্প ব্যয়, অর্থবছর, নির্মাণকাজ ও বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট
তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান তারা। তা না হলে
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নির্মিত এই ভবনটি একসময়
সরকারি অর্থ অপচয় ও অব্যবস্থাপনার দৃশ্যমান
নিদর্শন হয়ে দাঁড়াবে।
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাইয়ুম তালুকদার
উপদেষ্টা সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা