প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
পকেটে টান, শরীরে ক্লান্তি
নাফিজ আল জাকারিয়া, জাবি ||
সবুজে ঘেরা ৭০০ একরের বিশাল ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। ক্লাসের তাড়া, লাইব্রেরির নিরিবিলি পরিবেশ কিংবা বন্ধুদের আড্ডা—দিনভর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয় শিক্ষার্থীদের। এই ছুটে চলার প্রধান অনুষঙ্গ প্যাডেল রিকশা বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কিন্তু যে বাহনটি হওয়ার কথা ছিল স্বস্তির, সেটিই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের এক নীরব যন্ত্রণার নাম। রিকশা না পাওয়া, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় আর চালকদের দুর্ব্যবহার—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসের যাতায়াত ব্যবস্থা এখন যেন এক গোলকধাঁধা।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাস পার করতে হয় একটি নির্দিষ্ট বাজেটের ওপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে প্রতিদিন যাতায়াতে যদি অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়, তবে সেটি বড় ধরনের মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করে।নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সুলতানা বলছিলেন তাঁর প্রতিদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, “দিনে ক্লাসের ফাঁকে বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আমাদের কয়েকবার যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু প্যাডেল রিকশার ভাড়া অটোরিকশার চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি। ১০ টাকার ভাড়া অনেক সময় চালকরা ২০ বা ৩০ টাকা চেয়ে বসেন। সারাদিন ক্লাস শেষে পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে ক্লান্ত শরীরে উঁচু-নিচু রাস্তায় বারবার রিকশা থেকে ওঠা-নামা করা খুব কষ্টের। বাধ্য হয়ে তখন অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। রিকশাচালকদের সাথে প্রতিদিনের এই দরকষাকষি ও তর্ক-বিতর্ক আমাদের একেবারেই পছন্দ নয়।”ক্যাম্পাসে প্রায় দেড়শো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করলেও, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—এই রিকশাগুলো তাদের নিতে চায় না। চালকদের নজর থাকে ক্যাম্পাসে আসা বহিরাগত যাত্রীদের দিকে।নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুযুর রহমানের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, “সেদিন সমাজবিজ্ঞানের সামনে দাঁড়িয়ে ১৫ নম্বর অটোটিকে ফাঁকা পেয়ে থামতে ইশারা করি। কিন্তু চালক ‘লোক আছে’ বলে ডেইরি গেটের দিকে চলে যায়। পরে দেখি সে একজন বহিরাগত যাত্রী নিয়ে আসছে। প্রতিবাদ করতে আমি ও আমার বন্ধু রাস্তার মাঝে দাঁড়ালে, চালক উল্টো অটোর গতি বাড়িয়ে দেয়! আমরা সরে না গেলে সেদিন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। অটোওয়ালারা বহিরাগতদের আনা-নেওয়া করতে চায়, আর আমরা শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ি।”অর্থনীতি বিভাগের সাবিকের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, “হল থেকে বের হলে রিকশা পাই না। অথচ তারা গেরুয়া বা অন্যান্য গেট থেকে বহিরাগত যাত্রী নিয়ে ঠিকই ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে পারাপার করছে। আমাদের ফেলে তারা বাইরের যাত্রীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এদের ক্যাম্পাসের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখা খুব জরুরি।”শুধু রিকশা নয়, ক্যাম্পাসে চলাচলকারী ইলেকট্রিক কার্টগুলোর বিরুদ্ধেও রয়েছে নিয়ম না মানার অভিযোগ। নির্দিষ্ট কয়েকটি রুটে চলার কথা থাকলেও, তারা কেবল নিজেদের সুবিধামতো একটি রুটেই যাত্রী পরিবহন করে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ খরচের অজুহাতে বন্ধ রয়েছে শিক্ষার্থীদের শাটল বাস সার্ভিসটিও।যাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, সেই চালকদেরও রয়েছে নিজেদের কিছু অসহায়ত্ব। তীব্র রোদ বা বৃষ্টিতে ভিজে প্যাডেল ঘোরানো মানুষগুলোর জীবনের গল্পটাও খুব একটা সহজ নয়।প্যাডেল রিকশাচালক ফয়েজ মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “মামা, এই ক্যাম্পাসে আমি দুই বছর ধরে রিকশা চালাই। কখনো কোনো শিক্ষার্থীর সাথে বাজে আচরণ করিনি। আমরা যারা পুরোনো, তারা চার্ট মেনেই ভাড়া নিই। সমস্যা করে নতুন আসা চালকরা। তারা কিছুদিন থেকে চলে যায়, ক্যাম্পাসের নিয়ম বোঝে না। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা খুশি হয়ে ১০-২০ টাকা বেশি দিলে, নতুনরা ভাবে এটাই বুঝি নিয়ম। ওরাই না বুঝে শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ আচরণ করে।”অটোরিকশাচালক শাহাবুদ্দিন শোনালেন আরেক বাস্তবতার কথা। মলিন কণ্ঠে তিনি বলেন, “মামা, আমাদের আসলে খুব বেশি টাকা কামাই হয় না। নিজের রিকশা নেই, ভাড়ায় চালাই। সারাদিনের ইনকাম থেকে মহাজনের ভাড়া মিটিয়ে তারপর সংসার চালাতে হয়। শিক্ষার্থীরা ১ জন উঠলেও যে ভাড়া দেয়, ২-৩ জন উঠলেও একই ভাড়া দিতে চায়। একটু বেশি আয়ের আশায় বাধ্য হয়েই আমরা বহিরাগত যাত্রী তুলি। তবে হ্যাঁ, কিছু উগ্র চালকের কারণে আমাদের সবার বদনাম হয়, তাদের বিচার হওয়া উচিত।”শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি নিরসনে এবার নড়েচড়ে বসেছে ছাত্র সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) পরিবহন সম্পাদক তানভীর রহমান আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা প্যাডেল ও অটোরিকশার একটি প্রপার ভাড়ার চার্ট দেব। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব তারা যেন চার্ট অনুযায়ী ভাড়া দেন। আজ থেকে কোনো অটোরিকশা আর গেটে দাঁড়াতে পারবে না, তাদের নির্দিষ্ট এরিয়ার ভেতর ঢুকতে হবে। ইলেকট্রিক কার্টগুলোও যেন দূরবর্তী হলগুলোতে যায়, সেজন্য আমরা পরিবহন কমিটির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছি।”বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন, “শিক্ষার্থী ও রিকশাচালকদের মধ্যে এই গণ্ডগোল বা হাতাহাতি একেবারেই কাম্য নয়। আমরা প্যাডেল রিকশাচালকদের সাথে কথা বলে একটি যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করব। ইলেকট্রিক কার্টগুলোকে নির্দিষ্ট রুট করে দেওয়া হবে; রুট না মানলে তাদের ক্যাম্পাসে চলতে দেওয়া হবে না। আর অটোরিকশাগুলোর জন্য আমরা কিছু নির্দিষ্ট ‘স্টপেজ’ করে দেওয়ার কথা ভাবছি, যাতে মাঝপথ থেকেও শিক্ষার্থীরা রিকশায় উঠতে পারে। এর মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকেই একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা সম্ভব হবে।”শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু আশ্বাস বা কাগজে-কলমে রুট নির্ধারণ নয়, প্রশাসন যেন এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। হাজারো শিক্ষার্থীর এই ক্যাম্পাসে যাতায়াত ব্যবস্থা ফিরে পাক স্বস্তি, অবসান হোক প্রতিদিনের এই নীরব ভোগান্তির- এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কাইয়ুম তালুকদার
উপদেষ্টা সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা