প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাগান
মো: সামীর আল মাহমুদ , ঝালকাঠি ||
নৌকাভর্তি সবুজ-হলুদ তাজা পেয়ারা, খালের মোহনায় শত শত নৌকার নান্দনিক সারি আর পানির ওপর ভাসমান বিক্রেতাদের হাঁকডাক বলছি এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম পেয়ারা উৎপাদন কেন্দ্র এবং ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত ঝালকাঠির ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজারের কথা। বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ অঞ্চলের এই জনপ্রিয় পর্যটনস্থল।পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে প্রায় শতাব্দী প্রাচীনকাল থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ হচ্ছে পেয়ারার, যা বর্তমানে ঝালকাঠি জেলার একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।সাধারণত প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর (বাংলা আষাঢ় থেকে ভাদ্র) মাস পর্যন্ত এখানে নৌকাভর্তি পেয়ারার হাট বসে। এই ভাসমান বাজারের সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত ইতিহাস না থাকলেও স্থানীয়দের মতে এটি শত বছরেরও বেশি পুরনো। ভিমরুলির প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান ভবেন্দ্রনাথ হালদার জানান, এই অঞ্চলে পেয়ারা চাষ ও ভাসমান বাজারটির বয়স প্রায় ২০০ বছর।প্রাকৃতিক বৈরিতাকে জয় করে স্থানীয় কৃষকেরা জলাভূমিকে ব্যবহার করে এক অভিনব চাষ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। বর্ষার মৌসুমে যখন চারপাশ পানিতে ডুবে যায়, তখনো পেয়ারা গাছগুলো পানির ওপর বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চাষিরা তখন ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে গাছের ডাল থেকে তাজা পেয়ারা সংগ্রহ করেন। আর এই পুরো বেচাকেনার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় খালের পানির ওপর, নৌকা বা ট্রলারে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে এই জমজমাট ভাসমান হাট। থাইল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ফ্লোটিং মার্কেট’-এর সাথে এই হাটের দারুণ মিল রয়েছে।তথ্যমতে, বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ ভাগই উৎপাদিত হয় ঝালকাঠির বিভিন্ন গ্রামে। জেলার আটঘর, কুরিয়ানা, ডুমুরিয়া, বেতরা, ডালুহার ও সদর এলাকার প্রায় ২৪,০০০ একর জমিতে এবং পিরোজপুরসহ মোট ৩১,০০০ একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই পেয়ারার চাষ হয়। আর এই বিশাল অঞ্চলের পেয়ারা কেনাবেচার মূল কেন্দ্রস্থল হলো ভিমরুলির এই ভাসমান বাজার।ভিমরুলির এই পেয়ারা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের মূল ভরসা নৌকা বা ট্রলার। তবে স্থানীয়রা জানান, যান্ত্রিক ট্রলারের চেয়ে চিরাচরিত দাঁড়টানা নৌকায় ঘুরে দেখার মজাই আলাদা। পুরো খাল ঘুরে দেখতে নৌকাভেদে সাধারণত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়, তবে ভ্রমণের আগে দরদাম করে নেওয়া ভালো।দুই-তিন জনের দল হলে ছোট নৌকা নিয়ে অনায়াসেই ঢুকে পড়া যায় পেয়ারা গাছের নিচে গড়ে ওঠা সরু খালের ভেতর। গাছের পাতা মাথায় ছুঁয়ে যাওয়া আর চোখের সামনে ঝুলতে থাকা পাকা ডাসা পেয়ারার দৃশ্য পর্যটকদের এক দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি দেয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানকার পেয়ারা সম্পূর্ণ ফরমালিনমুক্ত। পর্যটকেরা সরাসরি গাছ থেকে পেড়ে তাজা পেয়ারার স্বাদ নিতে পারেন।খালের মাঝপথে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ভাসমান টং দোকান ও খাবারের হোটেল। জলভ্রমণের ক্লান্তি দূর করতে পর্যটকেরা সহজেই এসব ভাসমান দোকানে নেমে চা-নাস্তার বিরতি নিতে পারেন।দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বরিশাল বা ঝালকাঠি শহরে এসে সেখান থেকে বাস, ট্রলার বা স্থানীয় যানবাহনে চড়ে স্বরূপকাঠির ভিমরুলিতে আসা যায়। ভিমরুলির পাশাপাশি কাছাকাছি কুড়িয়ানা ও আটঘর এলাকার পেয়ারা বাগান এবং আমড়া বাগানও পর্যটকদের কাছে সমান জনপ্রিয়। চারদিকের মুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ, সবুজ গাছপালা আর নৌকার সারি—সব মিলিয়ে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে ভিমরুলির এই ভাসমান পেয়ারা বাজার ভ্রমণপিয়াসুদের জন্য এক আদর্শ স্থান।
প্রকাশক: শেখ মাহমুদ উজ্জ্বল
সম্পাদক: ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী
জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটি, হাউস-২, রোড-৬, ব্লক-কে, আফতাবনগর, ঢাকা ১২১২।
কপিরাইট © ২০২৬ । বিপ্লবী বার্তা